এম এ মোমিন, ক্রাইম রিপোর্টার: সীমান্তের কাঁটাতার আর আইনি জটিলতার বেড়াজালে দীর্ঘ ১১ মাস আটকে থাকার পর অবশেষে নিজ দেশে ফিরলেন ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈলের দিনমজুর আইজুর রহমান (৩৫)। তবে জীবিত নয়, ফিরলেন নিথর দেহ হয়ে।
শুক্রবার (৪ এপ্রিল, ২০২৬) দুপুরে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাঁর মরদেহ বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
নিহত আইজুর রহমান ঠাকুরগাঁও জেলার রাণীশংকৈল উপজেলার সাহানাবাদ গ্রামের মরতুস আলীর সন্তান। গত বছরের মে মাসে নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ সময় পর গত ২২ মার্চ ভারতের একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও পরিবারের দাবি
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের মে মাসে স্থানীয় একটি ক্ষেতে ভুট্টা ভাঙার কাজ শেষে সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় ঘাস কাটতে গিয়েছিলেন আইজুর। স্বজনদের অভিযোগ, বিএসএফ সদস্যরা জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে তাঁকে অন্যায়ভাবে ধরে নিয়ে যায় এবং বেধড়ক মারধর করে তাঁর পা ভেঙে দেয়। এরপর দীর্ঘ সময় তাঁর কোনো হদিস মেলেনি।
পরবর্তীতে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত একটি ভিডিওর মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, আইজুর উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং সেখানে বন্দি অবস্থায় আছেন। পরিবারের সদস্যরা তাঁর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেও আইনি জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। গত ২২ মার্চ এক ভারতীয় আইনজীবীর মাধ্যমে তাঁর মৃত্যুর সংবাদ পৌঁছায় বাংলাদেশে।
সীমান্তে হৃদয়বিদারক দৃশ্য
শুক্রবার দুপুরে তেঁতুলিয়া সীমান্তে আইজুরের মরদেহ হস্তান্তরের সময় এক শোকাবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রিয়জনের নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা। বিকেলে মরদেহটি তাঁর নিজ গ্রাম সাহানাবাদে পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
আইজুরের স্ত্রী ও সন্তানরা এই ঘটনাকে ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’ বলে দাবি করেছেন। নিহতের স্ত্রী কান্নাকণ্ঠে বলেন: “আমার স্বামী কোনো অপরাধী ছিলেন না। তাঁকে আমাদের সীমানা থেকেই ধরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে পিটিয়ে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছিল। একজন দিনমজুরকে এভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো—আমি সরকারের কাছে এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই।”
মরদেহ হস্তান্তরের সময় বিজিবি ও স্থানীয় পুলিশের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে রাণীশংকৈল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে এবং বিস্তারিত তথ্য পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, শুক্রবার সন্ধ্যায় জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে আইজুর রহমানের মরদেহ দাফন করার কথা রয়েছে। দীর্ঘ ১১ মাস নিখোঁজ থাকার পর এক দিনমজুরের এমন মৃত্যুতে সীমান্ত এলাকায় জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
https://slotbet.online/