পোশাকের আবিষ্কার নিঃসন্দেহে মানব সভ্যতার অন্যতম মাইলফলক। আদিম যুগে গুহাবাসী মানুষ যখন গাছের ছালবাকল পরা শুরু করে তখন থেকেই মূলত সভ্য যুগের যাত্রা শুরু। অবশ্য তখন পোশাক ছিল শুধুই লজ্জা নিবারণের মাধ্যম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পোশাক কেবল লজ্জা নিবারণই নয়, হয়ে উঠেছে মানুষের রুচিবোধ প্রকাশের মাপকাঠি। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফ্যাশনে এসেছে নতুন নতুন ধারা। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পোশাক শিল্পের উত্থান। আর এই উত্থানের জন্যই বর্তমানে পোশাক খাতকে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দূষণকারী খাত বলে দায়ী করা হয়। তবে পোশাক খাতের মাধ্যমে এই বিপর্যয়ের বিষয়টি মাথায় রেখেই পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনের নতুন ধারা এনেছে স্বপ্নবাজ দুই তরুণ। তাদের পোশাকের ব্রান্ড গুডিব্রো পরিবেশের সুরক্ষার পাশাপাশি ফ্যাশানে এনেছে পরিমিতি বোধ ও স্থায়িত্ব-এই দুয়ের মিশেল।
গুডিব্রোর যাত্রা শুরু হয় দুই ২০১৯ সালের জুলাইয়ে, দুই বন্ধু আহনাফ ও সাফিনের হাত ধরে। অনলাইনে কেনাকাটা করতে গিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম না পাওয়ার বেশ হতাশ ছিলেন সদ্য কৈশোর পেরুনো এই দুই তরুণ। দেশের মধ্যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কেনাকাটার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য পোশাক ব্রান্ড গড়ে তোলার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধেই তুলে নিয়ে চাইছিলেন তারা। সেই তাগিদ থেকে অনেকটা পরীক্ষামূলকভাবেই গুডিব্রোর যাত্রা শুরু হয়। তবে শুরুটা ছিল দুদার্ন্ত। ফেসবুকে বিক্রিরে পোস্ট দেওয়ার প্রথম দিনেই ৫০টি পোশাক বিক্রি হয়। এই অভাবনীয় সাড়ায় আপ্লুত হয়ে নিজেদের বিপপণ কৌশলকে আরেকটু ঢেলে সাজান তারা। পরের দিন দ্বিগুণ বিক্রি হয়। এরপর আর থেকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি তাদের।
বর্তমানে গুডিব্রোর ৩০ জনের বেশি নিবেদিত প্রাণ কর্মী রয়েছে। বনানীটিতে তাঁদের কার্যালয়। গুণগত মানের ব্যাপারে আপোষহীন ও সঠিক সময়ে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার জন্য সব শ্রেণীর ক্রেতার কাছে দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে গুডিব্রো। এমনকি কর্পোরেট অঙ্গণদের শুরু করে তারকাদের কাছেও রয়েছে গুডিব্রোর দারুণ জনপ্রিয়তা। বর্তমানে দেশের উদীয়মান ই-কর্মাসের জগতের শীর্ষে থাকা গুডিব্রোর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রচুর ফ্যান ও ফলোয়ার রয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্ট মার্কেটিংয়েও দারুণ সফলতা পেয়েছে গুডিব্রো। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডাটা অ্যানালাইসিসসহ নানা ধরনের আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে কাজ করে যাচ্ছে প্রগতিশীল এই প্রতিষ্ঠান।
তবে প্রতিষ্ঠানের ব্যাপক প্রসারের পরও গুডিব্রো নিজেদের মূলমন্ত্র থেকে সরে আসেনি। গুণগত মান বজায় রেখে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে সেরা পণ্যটিই। গুডিব্রোর রয়েছে নিজস্ব রপ্তানিমুখী কারখানা। এখানে কাপড় কাটা থেকে শুরু করে ক্রেতার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা হয়।
গুডিব্রো ফ্যাশন ও ট্রেন্ডের পরিধি ছাড়িয়ে স্থায়িত্বের প্রতি জোর দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। পোশাক তৈরিতে পরিবেশ সুরক্ষায় প্রাধান্য দেওয়ায় ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর রিসার্চ অ্যান্ড টেস্টিং ইন দ্য ফিল্ড অফ টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার ইকোলজির কাছ থেকে সনদপত্রও পেয়েছে গুডিব্রো। পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে আনতে গুডিব্রোর পণ্যে ব্যবহৃত তুলা পুনব্যবহৃত পানি নিয়ে উৎপাদনের বিষয়টি নিশ্চিত করে। পরিবেশ রক্ষায় এই অবদানের জন্য ক্রেতারাও গর্বের সঙ্গেই বেছে নেয় গুডিব্রোর পোশাক। গুণগত মান আর বিশ্বমানের গ্রাহক সেবার কারণেও ক্রেতারা ভীষণ সন্তুষ্ট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে ক্রেতাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা তারই প্রমাণ।
পরিবেশ রক্ষায় গুডিব্রোর অবদান কিন্তু এখানেই শেষ নয়। প্লাস্টিকের ব্যবহার হ্রাসের জন্যও সক্রিয়ভাবে কাজ করে চলেছে তারা। বর্তমানে পরীক্ষামূলক পাটের তৈরি ‘সোনালি ব্যাগের’ ব্যবহার শুরু করেছে গুডিব্রো। পরিবেশের সুরক্ষার পাশাপাশি বাংলাদেশের ফ্যাশন শিল্পে বিপ্লব ঘটানোর জন্য গুডিব্রো যে অভিযান শুরু করেছে তার সঙ্গেই এই উদ্যোগ পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সেন্ট জোসেফে পড়ার সময় থেকেই সাফিন ও আহনাফের বন্ধুত্ব। পরে অবশ্য আহনাফ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিংয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে জনসংযোগ ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে ব্রান্ড প্রোমোটিং শুরু করে গড়ে তোলেন নিজস্ব ব্যান্ড। অন্যদিকে সাফিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল আইবিএ থেকে মার্কেটিংয়ে পড়াশোনা শেষে স্মার্ট ব্যবসা কৌশল কাজে লাগিয়ে নিজস্ব ব্রান্ড তৈরি করেন। তারা দুইজনই ডিজিটাল মার্কেটিং ও ফ্যাশন ই-কমার্সের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞ। উদ্যোমী এই দুই তরুণের সাফল্য নিয়ে টেন মিনিট স্কুলে কোর্সও রয়েছে।
ব্যবসার পাশাপাশি গায়ক হিসেবেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন সাফিন। ‘চল বন্ধু চল’ ও ‘পুড়ে গেলাম’ গান দুটির জন্য দুইবার প্রথম আলো পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন প্রতিভাবান এই তরুণ।
হতাশ ক্রেতা থেকে একটি সফল ব্রান্ডের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সাফিন ও আহনাফ নিজেদের দূরদৃষ্টি ও দৃঢ়প্রত্যয়ী মনোভাবের প্রমাণ রেখেছেন। তারা দেখিয়ে দিয়েছেন পরিমিতি বোধ ও স্থায়িত্ব কেবল ফ্যাশনের একই ধারাই নয়, ভবিষ্যত ফ্যাশনের জন্য অপরিচার্য অনুষঙ্গও বটে। গুডিব্রো অনুপ্রেরণার ও উদ্ভাবনী চিন্তা ধারার একটি অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছে। প্রমাণ করেছে যে গুণগত মান বজায় রেখে পরিমিতি বোধ আর পরিবেশ সুরক্ষার প্রতি অঙ্গীকারেই আসলে বদলে দিতে পারে ফ্যাশন শিল্পকে।
তবে মাত্র ২৫ বছরেই সাফল্যের নাগাল পেলেও এখানেই থামতে চান না তারা। বাংলাদেশ তৈরি পোশক শিল্পে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এদেশে এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক ব্রান্ড গড়ে ওঠেনি। প্রতিভাবান এই দুই তরুণ তাই চান , দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক দরবারে একটি আন্তর্জাতিক ব্রান্ড হিসেবে গুডিব্রোর সুনাম ছড়িয়ে দিতে।
https://slotbet.online/