মো. শামীম হোসাইন: মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হয়েছিল আট মাস আগেই। এবার দুর্ঘটনায় হারাল বাবাকেও। যে বাবাই ছিল তার একমাত্র আশ্রয়, সেই বাবার সঙ্গেই শেষবারের মতো কাজে বের হয়েছিল সাড়ে চার বছরের নাঈম। কাঠবোঝাই সেই ভ্যান উল্টে প্রাণ হারিয়েছেন বাবা স্বপন। আর গুরুতর আহত নাঈম এখন ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। কান দিয়ে রক্ত পড়ছে, ভেঙে গেছে বাম পায়ের নিচের অংশের হাড়, মাথায়ও রয়েছে গুরুতর আঘাত। অর্থের অভাবে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার চিকিৎসা।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার সোহাগদল গ্রামের হাজীরপুল এলাকায় স্টিলব্রিজের পাশে এ দুর্ঘটনা ঘটে। কাঠবোঝাই একটি ভ্যান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে খালের পাড়ে রাখা গোলকাঠের ওপর উল্টে গেলে ঘটনাস্থলে গুরুতর আহত হন ভ্যানচালক স্বপন। ভ্যানে থাকা তাঁর ছেলে নাঈম ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক স্বপনকে মৃত ঘোষণা করেন।
স্বপন ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। দিনমজুরির পাশাপাশি কাঠবোঝাই ভ্যান চালিয়ে সংসার চালাতেন তিনি। তাঁর তিন ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়েছে প্রায় এক বছর আগে।
প্রায় আট মাস আগে নাঈমকে রেখে তাঁর মা অন্যত্র চলে যাওয়ার পর শিশুটির পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে স্বপনের ওপর। অভাবের সংসার হলেও ছেলেকে কখনো একা রাখতেন না তিনি। কাজের সময়ও নাঈমকে সঙ্গে নিয়ে বের হতেন। বাবার সঙ্গে ভ্যানেই কাটত শিশুটির দিনের বড় একটি সময়।
মঙ্গলবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বছরাকাঠি এলাকার একটি কাঠের দোকান থেকে চেরাই কাঠ নিয়ে অন্যত্র যাচ্ছিলেন স্বপন। ভ্যানে তাঁর সঙ্গে ছিল আদরের ছেলে নাঈম।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হাজীরপুল এলাকায় স্টিলব্রিজের উঁচু অংশে ওঠার সময় হঠাৎ ভ্যানটি নিয়ন্ত্রণ হারায়। মুহূর্তের মধ্যে সেটি রাস্তার পাশে খালের পাড়ে রাখা গোলকাঠের ওপর উল্টে যায়। ভ্যান ও কাঠের নিচে চাপা পড়েন স্বপন। আর ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হয় নাঈম।
দুর্ঘটনার বিকট শব্দ ও শিশুটির চিৎকারে আশপাশের মানুষ ছুটে আসেন। স্থানীয়রা দ্রুত বাবা-ছেলেকে উদ্ধার করে নেছারাবাদ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক স্বপনকে মৃত ঘোষণা করেন। গুরুতর আহত নাঈমকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বরিশালে পাঠানো হয়। অবস্থার অবনতি হলে পরে তাকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
নাঈমের চাচা মো. সাদ্দাম বলেন, ‘আমার ভাই আর নেই। চার বছরের নাঈম এখন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। শিশুটির কান দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। বাম পায়ের নিচের অংশের হাড় ভেঙে গেছে। মাথায়ও গুরুতর আঘাত রয়েছে। অর্থের অভাবে চিকিৎসা চালিয়ে নিতে আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রায় আট মাস আগে নাঈমকে রেখে তার মা অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকে আমার ভাই সবসময় ছেলেকে সঙ্গে রাখত। কাজের সময়ও একা রেখে যেত না। এখন সেই বাবাটাও নেই।’
নাঈমের বড় বোন সুবর্ণার কণ্ঠেও অসহায়ত্ব। তিনি বলেন, ‘নাঈম আমার ছোট ভাই। আমাদের মা নেই। তাই বাবা সবসময় ওকে সঙ্গে নিয়েই কাজে বের হতেন। মা থাকতেও নেই। শেষমেশ বাবাও চলে গেল। এখন আমার ভাইটাও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে।’
প্রত্যক্ষদর্শী মো. মাসুদ বলেন, দুর্ঘটনাস্থলের পাশে তাঁর দোকান। হঠাৎ বিকট শব্দ ও শিশুর চিৎকার শুনে বাইরে এসে দেখেন, স্টিলব্রিজের কাছে গোলকাঠের ওপর কাঠবোঝাই ভ্যানটি উল্টে পড়ে আছে। ভ্যানের নিচে চালক এবং পাশে শিশুটিকে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়।
স্বপনের মরদেহ যখন মাটির নিচে, তখন তাঁরই আদরের সন্তান নাঈম হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। মা নেই, বাবাও নেই—এই ছোট্ট শিশুটির সামনে এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ।
পরিবারের একদিকে শোক, অন্যদিকে চিকিৎসার ব্যয় মেটানোর দুশ্চিন্তা। স্বজনদের সামর্থ্য সীমিত হওয়ায় নাঈমের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
https://slotbet.online/