মোঃ নজরুল ইসলাম খান, স্টাফ রিপোর্টার: শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। জাতি গঠনে শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রভাব অনস্বীকার্য। কাজেই শিক্ষাকে সঠিক উপায়ে সর্বস্তরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সুষম বিকাশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা কার্যক্রমের অন্যতম মৌলিক উপাদান হলেন শিক্ষক। শিক্ষকদের দক্ষতা, যোগ্যতা, মেধা, সৃজনশীলতা ও নেতৃত্বগুণ শিক্ষার্থীদের মননশীলতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করা ছাড়া একটি জ্ঞানভিত্তিক জাতি গঠন করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জাতিসংঘ গুণগত শিক্ষাকে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (SDG) ৪ নম্বর লক্ষ্যে স্থান দিয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদেও শিক্ষার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় মৌলিক দায়িত্ব হিসেবে স্থান পেয়েছে। একইসঙ্গে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা UNESCO শিক্ষা খাতে সংশ্লিষ্ট দেশের মোট জিডিপির ৪ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখার পরামর্শ দিয়েছে।
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে বিগত পাঁচ বছরের বাজেট বরাদ্দের চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রতিবছর শিক্ষা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ কমবেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশের শিক্ষা খাত প্রধানত তিনটি স্তরে বিভক্ত—প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষা। এর পাশাপাশি মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষার পৃথক স্তরও বিদ্যমান।
মূল বাজেট অনুযায়ী কোটি টাকায় বিভিন্ন স্তরে বিগত পাঁচ বছরের বরাদ্দের চিত্র হলো—
২০২১–২২: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রায় ২৬,৩১৪ কোটি টাকা; মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা প্রায় ৩৬,৪৮৭ কোটি টাকা; কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা প্রায় ৯,১৫৩ কোটি টাকা।
২০২২–২৩: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা ৩১,৭৬১ কোটি টাকা; মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ৩৯,৯৬১ কোটি টাকা; কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা ৯,৭২৭ কোটি টাকা।
২০২৩–২৪: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা ৩৪,৭২২ কোটি টাকা; মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ৪২,৮৩৮ কোটি টাকা; কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা ১০,৬০২ কোটি টাকা।
২০২৪–২৫: শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ৯৪,৭১১ কোটি টাকা।
২০২৫–২৬: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা ৩৫,৪০৩ কোটি টাকা; মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা ৪৭,৫৬৪ কোটি টাকা; কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা ১২,৬৭৮ কোটি টাকা।
বিগত পাঁচ বছরের বাজেট বরাদ্দের চিত্র পর্যালোচনা করে বলা যায়, শিক্ষা খাতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বরাদ্দের পরিমাণ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সময়ে শিক্ষা ব্যয়, অংশীজনের সংখ্যা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে যাচ্ছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় সরকারি কলেজের ভূমিকা
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তর বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশে প্রায় ৬৩০টি সরকারি কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৯৮টি কলেজ ২০১৮ সালের বিধির আলোকে জাতীয়করণ করা হয়েছে। ২০১৮ সালের বিধির আওতাবহির্ভূত অন্যান্য কলেজ ২০০০ সালের বিধির আলোকে জাতীয়করণ করা হয়েছে।
উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ক্যাডার কম্পোজিশন রুলস, ১৯৮০ প্রণয়ন করে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার চালু করে। এই রুলসের আলোকে ২৯টি ক্যাডার চালু করা হয়েছিল। বর্তমানে দেশে ২৬টি ক্যাডার রয়েছে। এই ২৬টি ক্যাডারের মধ্যে বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার কলেজ পর্যায়ে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে বিসিএস ক্যাডারে নিয়োগ নিশ্চিত করা হয়। পিএসসি সুপারিশ করার পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় মহামান্য রাষ্ট্রপতির অনুমোদন সাপেক্ষে গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নিয়োগ প্রদান করে। বর্তমানে মাঠপর্যায়ে ৪৪তম বিসিএস ব্যাচ পর্যন্ত কর্মকর্তারা কর্মরত আছেন।
পদোন্নতিতে দীর্ঘসূত্রিতা
ইতোমধ্যে ৩৬তম বিসিএস ব্যাচ আট বছর অতিক্রম করে নবম বছরে পদার্পণ করেছে। বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার ছাড়া অন্য ২৫টি ক্যাডারের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে পদোন্নতি পেয়েছেন। অধিকন্তু, ৩৮তম বিসিএসের অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তারাও পদোন্নতি পেয়েছেন।
কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতির ক্ষেত্রে নানা ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কথা সামনে আসে। কখনো প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা, আবার কখনো বিভিন্ন ধরনের আইনি জটিলতা—সব মিলিয়ে শিক্ষা ক্যাডারের বিভিন্ন ব্যাচের পদোন্নতি যেন ‘সোনার হরিণে’ পরিণত হয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তবে এ পদোন্নতিতে কোনো আর্থিক সংশ্লেষ ছিল না। সাধারণভাবে ‘পদোন্নতি’ শব্দটি বেতন-ভাতা ও আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও শিক্ষা ক্যাডারের ক্ষেত্রে বিষয়টি অনেকাংশে ব্যতিক্রম।
নির্ধারিত পাঁচ বছরে পদোন্নতি না হওয়ায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মকর্তারা বেতন স্কেলের ধাপ অতিক্রম করে ফেলেন। ফলে পরবর্তীতে পদোন্নতি পেলেও এর আর্থিক সুফল তেমন থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে শুধু পদবির পরিবর্তন হয়। অথচ এই পদবির পরিবর্তনের জন্য দীর্ঘ আলোচনা, আইনি লড়াই এবং নানা ধরনের আনুষঙ্গিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
প্রতিবার পদোন্নতির জন্য মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে ৩৩তম বিসিএস ব্যাচ প্রায় ১২ বছর পর প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছে। ৩৫তম বিসিএস ব্যাচ প্রায় আট বছর পর পদোন্নতি পেয়েছিল।
অন্যদিকে, শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬তম ব্যাচ নয় বছর, ৩৭তম ব্যাচ আট বছর এবং ৩৮তম ব্যাচ ছয় বছর অতিক্রম করছে। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, তাঁদের অনেকেই এখনও প্রভাষক পদে রয়েছেন। অথচ অন্যান্য ক্যাডারে তাঁদের ব্যাচমেটরা ইতোমধ্যে ষষ্ঠ গ্রেডের মর্যাদা লাভ করেছেন।
আইনি জটিলতা কতটা যৌক্তিক?
এ অবস্থায় অত্যন্ত যৌক্তিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতির ক্ষেত্রে এত দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং আদালতের বহুমাত্রিক স্টে অর্ডারের প্রয়োজন কেন?
কেউ যদি মনে করেন যে তিনি তাঁর ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাহলে তাঁর অধিকার আদায়ের জন্য যথাযথ আইনের আলোকে আদালতের নির্দেশনা চাওয়ার সুযোগ অবশ্যই থাকবে এবং সেই নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট সবার জন্য পালনীয় হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ৩০ কিংবা ৪০ জনের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ২,০০০–৩,০০০ কর্মকর্তার পদোন্নতি-সংক্রান্ত কার্যক্রমও দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত হয়ে থাকে।
এ ছাড়া শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতির ক্ষেত্রে পদসৃজনের বিষয়টিও সামনে আসে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ সৃজন ছাড়া পদোন্নতি সম্ভব নয়। এই শর্তের বেড়াজালের মধ্যেও শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতির ক্ষেত্রে আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট ছাড়পত্রের প্রয়োজন হয়।
ফলে পদোন্নতির এই বহুমাত্রিক ধাপ ও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে শিক্ষা ক্যাডারের পদোন্নতি অনেকটা ‘সোনার হরিণের’ মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতি চাই
তাই সরকারের কাছে আমাদের দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট—শিক্ষা ক্যাডারের কোনো কর্মকর্তা চাকরি স্থায়ীকরণের শর্ত পূরণ এবং সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে তাঁকে নির্ধারিত পাঁচ বছরের মধ্যে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রদান করা হোক।
লালন সাঁইয়ের ভাষায় বলতে হয়, “সময় গেলে সাধন হবে না।” প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নির্দিষ্ট সময়ে পদোন্নতি না এলে বিলম্বিত পদোন্নতি অনেকটাই জৌলুশ হারিয়ে ফেলে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর পদোন্নতি এলেও তখন সেই পদোন্নতির আনন্দ ও আকর্ষণ অনেকাংশে ম্লান হয়ে যায়।
শিক্ষক জাতি গঠনের অন্যতম কারিগর। তাঁদের কর্মপ্রেরণা, মর্যাদা ও পেশাগত অগ্রগতির সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মানও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই পদোন্নতিকে দীর্ঘসূত্রতার মধ্যে না রেখে একটি সুস্পষ্ট, সময়বদ্ধ ও নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনা জরুরি।
অতএব, আমাদের বিনীত নিবেদন—শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদোন্নতি অন্যান্য ক্যাডারের ন্যায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রদান করা হোক। একই সঙ্গে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় দীর্ঘসূত্রিতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও অনিশ্চয়তা দূর করে একটি স্থায়ী ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হোক। এতে একদিকে যেমন শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে তাঁদের কর্মস্পৃহা ও পেশাগত মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে; যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপরও।
মো. মেহেদী হাসান
প্রভাষক
রসায়ন
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ
https://slotbet.online/