বিয়ে বিচ্ছেদ বা তালাক যেখানে একটি আইনি প্রক্রিয়া, সেখানে ঠাকুরগাঁওয়ের কাজী মোখলেছুর রহমানের কাছে এটি যেন স্রেফ ‘টাকার খেলা’। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে একই দম্পতির বিয়ে পড়ানো এবং মাত্র দুই দিন পর সেই বিয়ে ‘বাতিল’ লিখে দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। অভিযুক্ত এই কাজী এর আগে জালিয়াতির দায়ে জেল খাটলেও তাঁর অনৈতিক কর্মকাণ্ড থামেনি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও জেলা শহরের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম (ছদ্মনাম) এর বিয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাজী মোখলেছুরের এই জালিয়াতি ফাঁস হয়। সরকারি নথিতে দেখা যায়, ৩০ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে শফিকুলের বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন মোখলেছুর। কিন্তু রহস্যজনক কারণে বিয়ের মাত্র দুই দিন পরই কাজী নিজেই বিয়ের রেজিস্টারে ‘বাতিল’ লিখে দেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রেজিস্ট্রিকৃত বিয়ে এভাবে কলমের খোঁচায় ‘বাতিল’ করার কোনো বিধান নেই। তালাক দিতে হলে আলাদা তালাকনামা ও আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু কাজী মোখলেছুর মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই কাজ করেছেন। অথচ আশ্চর্যের বিষয় হলো, কাগজে-কলমে বিয়ে বাতিল দেখালেও সংশ্লিষ্ট দম্পতি গত দুই বছর ধরে সুখে সংসার করছেন।
বাল্যবিবাহ থেকে ব্যাকডেট এন্ট্রি
কাজী মোখলেছুরের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর কাছে টাকা দিলে যেকোনো অসাধ্য সাধন সম্ভব। মোটা অঙ্কের বিনিময়ে বয়স গোপন করে বিয়ে পড়ানো কিংবা আগের কোনো তারিখে বিয়ের নিবন্ধন দেখানো তার কাছে বাঁ হাতের খেলা। এছাড়াও তথ্য লুকানোর জন্য ভিন্ন ভিন্ন নিবন্ধন বই ব্যবহার এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে তালাকনামা তৈরি ও আগের বিয়ে গোপন করে পুনরায় বিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, জেলা রেজিস্ট্রি অফিসের তদারকি না থাকায় কাজী মোখলেছুর দিনের পর দিন এসব অপকর্ম করে যাচ্ছেন। কেউ কেউ এই সিন্ডিকেটে অফিসের লোকজনেরও যোগসাজশ থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কাজী মোখলেছুর রহমান দায় স্বীকার করে বলেন, “৩০ লাখ টাকা দেনমোহরের বিয়েটি বাতিলের কাজ করা আমার ভুল হয়েছে। বিভিন্ন মহলের চাপে এটি করতে হয়েছে।” জেল খাটার বিষয়টি তিনি ‘ভুল বোঝাবুঝি’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন এবং আগামীতে সতর্ক থাকার অঙ্গীকার করেন।
ঠাকুরগাঁও জেলা রেজিস্ট্রার মো. হেলাল উদ্দিন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এ ধরনের কাজ গুরুতর অপরাধ। তিনি বলেন, “বিয়ের দুদিন পর কাজী নিজ হাতে তা বাতিল করতে পারেন না। এটি সরাসরি আইনের লঙ্ঘন। আমরা অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখছি। সত্যতা পেলে তাঁর বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
শরিয়াহ এবং দণ্ডবিধি ১৮৬০-এর ৪৯৪ ধারা অনুযায়ী, বিয়ের তথ্য গোপন বা জালিয়াতি একটি দণ্ডনীয় অপরাধ। অর্থের লোভে এমন কর্মকাণ্ড পারিবারিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে বলে মনে করছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
https://slotbet.online/