মোঃ কামরুল হাসান লিটন, স্টাফ রিপোর্টার, (ময়মনসিংহ): ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহরের ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হল ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে। একই আগুনে সিনেমা হলসংলগ্ন অন্তত ১৫ থেকে ২০টি দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে এ অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় বুধবার রাত ৩টা ৪০ মিনিটের দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, সিনেমা হলের পাশে থাকা একটি এলপিজি সিলিন্ডারের গুদাম, ডেকোরেশন সামগ্রীর দোকান, পুরোনো কাপড়ের দোকানসহ বেশ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আগুনে পুড়ে গেছে। প্রাথমিকভাবে এলপিজি সিলিন্ডারের গুদাম থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে আগুনের প্রকৃত কারণ তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
অগ্নিকাণ্ডে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত ও হিসাব-নিকাশের পর ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিশ্চিত করবে বলে জানিয়েছে।
শুধু একটি সিনেমা হল নয়, এটি ছিল ইতিহাসের সাক্ষী
স্থানীয় ইতিহাস-সন্ধানীদের তথ্য অনুযায়ী, ঝলমল সিনেমা হলের ইতিহাস সাধারণ কোনো সিনেমা হলের মতো নয়। গৌরীপুর রাজবাড়ির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গড়ে ওঠা এই স্থাপনাটি একসময় ছিল একটি নাট্যমঞ্চ।
সাংবাদিক ও ইতিহাসসন্ধানী রায়হান উদ্দিন সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গৌরীপুর রাজবাড়ির পঞ্চম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর একমাত্র ছেলে এবং সংগীত ও নাট্যপ্রেমী বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে এই নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতার স্টার থিয়েটারের আদলে গড়ে ওঠা এই মঞ্চে নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সংগীতচর্চার আয়োজন হতো।
পরবর্তীকালে স্থাপনাটি চলচ্চিত্র প্রদর্শনের কাজে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। বিভিন্ন সময়ে এর নাম গিরি, প্রতিমা এবং সর্বশেষ ঝলমল সিনেমা হল হিসেবে পরিচিতি পায়। দীর্ঘ সময় ধরে এটি গৌরীপুরের মানুষের বিনোদন ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র ছিল।
প্রায় এক শতাব্দীর স্মৃতি
ঝলমল সিনেমা হলের সুনির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠাবর্ষের নির্ভরযোগ্য নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তবে স্থানীয় ইতিহাসসন্ধানীদের তথ্য অনুযায়ী, মূল নাট্যমঞ্চটি ১৯৩০-এর দশকে প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকলে ২০২৬ সালে স্থাপনাটির বয়স দাঁড়ায় আনুমানিক ৮৭ থেকে ৯৬ বছর। অর্থাৎ প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাস ও স্মৃতি বহন করছিল এই স্থাপনাটি।
পুরোনো এই স্থাপনাটি শুধু সিনেমা দেখার স্থান ছিল না; গৌরীপুরের সাংস্কৃতিক বিকাশ, নাট্যচর্চা ও স্থানীয় মানুষের বহু প্রজন্মের স্মৃতির সঙ্গে এটি জড়িয়ে ছিল। তাই অগ্নিকাণ্ডে এর ধ্বংসকে স্থানীয় ইতিহাস ও সংস্কৃতির জন্য বড় ধরনের ক্ষতি হিসেবে দেখছেন এলাকাবাসী।
ইতিহাসসন্ধানী রায়হান উদ্দিন সরকার বলেন, শতবছরের সাংস্কৃতিক স্মারক হিসেবে পরিচিত এই স্থাপনার এমনভাবে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া স্থানীয় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

তদন্তের অপেক্ষায় স্থানীয়রা
অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ কী এবং এতে মোট কত টাকার ক্ষতি হয়েছে—তা এখনো নিশ্চিত নয়। এলপিজি গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাতের প্রাথমিক ধারণা থাকলেও তদন্তের আগে এটিকে চূড়ান্ত কারণ হিসেবে দেখছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এলাকাবাসীর দাবি, গৌরীপুরের ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক স্মৃতিচিহ্নগুলো সংরক্ষণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, একটি পুরোনো স্থাপনা পুড়ে যাওয়ার সঙ্গে শুধু একটি ভবন ধ্বংস হয় না; এর সঙ্গে হারিয়ে যায় একটি জনপদের দীর্ঘদিনের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগের অনেক স্মৃতি।
প্রধান সম্পাদক: মুন্সী জামিল উদ্দিন প্রকাশক: মোসা মিতা খাতুন
সরকারি মিডিয়াভুক্ত জাতীয় দৈনিক বাংলার দূত
২১৯/১,নূরভবন (২য় তলা), ফকিরাপুল, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
ফোন নাম্বার : ০১৭১৮৭৫২৯০৯
ইমেইল: dailybanglardoot@gmail.com
সর্ব স্বত্ব সংরক্ষিত এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি,ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যাবহার বেআইনি।
Copyright © 2026 banglar doot. All rights reserved.