মোঃ নজরুল ইসলাম খান, স্টাফ রিপোর্টার: ঝলসানো পদোন্নতি—এই শিরোনামটি হয়তো অনেককে চমকে দেবে বা ভাবাবে। কিন্তু এটি কোনো অতিরঞ্জন নয়, বরং শিক্ষা ক্যাডারের বর্তমান বাস্তবতা। একই ব্যাচের অন্যান্য ক্যাডারে নির্ধারিত সময়ে পদোন্নতি হলেও শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬তম ব্যাচের প্রায় নয় বছর হতে চলছে। এখনো তাঁরা প্রভাষক পদেই রয়েছেন। ইতোমধ্যে ৩৭ ও ৩৮তম ব্যাচও পদোন্নতির সকল ধরনের যোগ্যতা অর্জন করেছেন। পদোন্নতি যেকোনো পেশায় কর্মস্পৃহা বাড়ায়, উদ্দীপনা জাগায় এবং কর্মক্ষমতাকে ত্বরান্বিত করে। কিন্তু যখন দেখা যায়, একই ব্যাচের অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পাচ্ছেন, আর নিজেরা সকল যোগ্যতা অর্জনের পরও পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তখন মানবিক সত্তায় এক ধরনের পীড়ন তৈরি হয়। মনের অজান্তেই হৃদয় ভারী হয়ে ওঠে। এ বাস্তবতাকে সামনে রেখে শিক্ষা ক্যাডারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো।
বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারে প্রবেশের পথ সহজ নয়। প্রিলিমিনারি, লিখিত, ভাইভা এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন—এই সব ধাপ অতিক্রম করেই একজন প্রার্থী চাকরিতে যোগদান করেন। এরপর চার মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করতে হয়। বিভাগীয় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর চাকরি স্থায়ীকরণ নিশ্চিত হয়। সন্তোষজনক চার বছর চাকরি অতিক্রম করার পর সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, শিক্ষা ক্যাডারের জন্য ৯০০ নম্বরের সাধারণ লিখিত পরীক্ষার পাশাপাশি আলাদা ২০০ নম্বরের বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষা রয়েছে। বিভাগীয় পরীক্ষায় শিক্ষা সংক্রান্ত ১০০ নম্বরের লিখিত পরীক্ষা এবং সিনিয়র স্কেল পরীক্ষায় আরও ১০০ নম্বরের বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষায় পাস করতে হয়। অর্থাৎ বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের বহুস্তরের কঠোর মূল্যায়ন এখানে বিদ্যমান। অন্য অনেক ক্যাডারের তুলনায় শিক্ষা ক্যাডারের এই বহুমুখী পরীক্ষা ব্যবস্থা অনেক বেশি কঠিন ও সময়সাপেক্ষ।
শুধু পরীক্ষা নয়, প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর জন্য বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের সুযোগ আছে, যার তদারকি করে College Education Development Project (CEDP)। এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে একজন শিক্ষক তাঁর বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান আরও শাণিত করার সুযোগ পান। একই সঙ্গে জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম)-এ গবেষণাকে প্রাধান্য দিয়ে Research Methodology নামক ৪৫ দিনের বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স চালু রয়েছে। ফলে শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের গবেষণা সক্ষমতা, দক্ষতা এবং বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান—সবকিছুই রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও শিক্ষা ক্যাডারে ১৫০০-এর বেশি পিএইচডি ডিগ্রিধারী কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান থেকে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। এ তথ্যই প্রমাণ করে যে, যোগ্যতার অভাব এখানে নেই।
রাষ্ট্র যদি শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের উচ্চ শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট সুযোগ-সুবিধাও বাড়াতে হবে। জেডিএস স্কলারশিপে শিক্ষা ক্যাডারের সংখ্যা বাড়ানো, কমনওয়েলথ স্কলারশিপে তাঁদের সুযোগ অবারিত করা, ইউরোপ, আমেরিকা ও গণচীনের সঙ্গে এমওইউ স্বাক্ষর করে পিএইচডি ডিগ্রির সুযোগ নিশ্চিত করা—এসব পদক্ষেপ জরুরি। আমাদের মহান রাষ্ট্রনায়কগণ আধুনিক, স্মার্ট ও শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই শিক্ষা ক্যাডার চালু করেছিলেন। বাংলাদেশের জাতি, সমাজ ও দেশ গঠনে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা প্রমিথিউসের মতো ভূমিকা পালন করেছেন, করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন—এ কথা বলা অত্যুক্তি নয়।
তবে বাস্তবতা অনেক কর্কশ। ৩৬তম বিসিএস ব্যাচ ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালে যোগদান করেন। শিক্ষা ক্যাডার ব্যতীত ৩৮তম ব্যাচ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ক্যাডারে পদোন্নতি হয়েছে। ব্যতিক্রম শুধু শিক্ষা ক্যাডার। মহাকালের নিয়মে কেটে গেছে প্রায় আট বছর। আসন্ন ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ নয় বছর পূর্ণ হবে। কিন্তু শিক্ষা ক্যাডারের ৩৬তম ব্যাচের পদোন্নতি যেন এখনো অধরা। গত ২১ জুলাই ২০২৬ তারিখে প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির লক্ষ্যে ডিপিসি সভা আহ্বান করা হয়েছিল। হতাশাজনক ও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো—কোনো ধরনের ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই সভা স্থগিত করা হয়। আজ পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এটি আমাদের সামাজিক ও প্রশাসনিক দর্শনেরই প্রতিফলন। শিক্ষা ক্যাডারে যোগদানের পর অনেক কর্মকর্তা ক্যাডার বদলের কথা ভাবেন—উপরের কারণগুলোই তার যথেষ্ট ব্যাখ্যা।
এই পরিস্থিতিতে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের সেই বিখ্যাত পঙ্ক্তি মনে পড়ে:
“আর প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা
কবিতা আজকে দিলাম তোমায় ছুটি
ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়
পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”
চারদিকে যখন পদোন্নতি হচ্ছে, তখন অভাগা শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা এটাকে ঝলসানো পদোন্নতি বলেই অনুভব করেন। উচ্চ শিক্ষা যেখানে অনেকের কাছে বিলাসিতা বা উচ্চাভিলাষী স্বপ্ন, সেখানে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও পদোন্নতি না পাওয়া মানে শুধু ব্যক্তিগত হতাশা নয়—এটি শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক মানকেও প্রভাবিত করে।
আমাদের স্পষ্ট প্রত্যাশা, ৩৬তম ব্যাচ থেকে ৩৮তম ব্যাচ পর্যন্ত যোগ্য সকলের পদোন্নতি দ্রুত সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করা হোক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সচিব, মাউশির মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। শিক্ষা ক্যাডারকে শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ করা মানেই দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শক্তিশালী করা। সময় এসেছে এই দীর্ঘসূত্রিতার অবসান ঘটানোর।
মো. মেহেদী হাসান
৩৬তম বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডার
প্রভাষক, রসায়ন বিভাগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ
প্রধান সম্পাদক: মুন্সী জামিল উদ্দিন প্রকাশক: মোসা মিতা খাতুন
সরকারি মিডিয়াভুক্ত জাতীয় দৈনিক বাংলার দূত
২১৯/১,নূরভবন (২য় তলা), ফকিরাপুল, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
ফোন নাম্বার : ০১৭১৮৭৫২৯০৯
ইমেইল: dailybanglardoot@gmail.com
সর্ব স্বত্ব সংরক্ষিত এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি,ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যাবহার বেআইনি।
Copyright © 2026 banglar doot. All rights reserved.